পটুয়াখালীতে ফেসবুকে সুইসাইড নোট লিখে নিভৃতে সাংবাদিক রাকিবের মহাপ্রয়াণ

পটুয়াখালীর দশমিনায় গভীর রাতে ফেসবুকে সুইসাইড নোট লিখে বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে নিভৃতে না ফেরার দেশে চলে গেলেন জাতীয় দৈনিক যায়যায়দিনের উপজেলা প্রতিনিধি মো. রাকিব হোসাইন (৩৫)।
রোববার (৩১ মে) ভোর সাড়ে ৬ টার দিকে দশমিনা-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের বাউফল এলাকায় তার মৃত্যু হয়।
রাকিব পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড উত্তর চরবিশ্বাস গ্রামের মোক্তার মেলকারের ছেলে। দশমিনার চরহোসনাবাদ এলাকায় তার নানা বাড়ি থাকার সুবাদে শৈশব-কৈশোর থেকেই দশমিনাতে বড় হয়েছেন।
জানা যায়, সাংবাদিকতার পাশাপাশি দশমিনা বাজারে যৌথ মালিকানায় ফার্মেসী ব্যবসা করতেন রাকিব। বাজারের উত্তর পাশের একটি বিল্ডিংয়ের তিন তলায় একটি কক্ষে একা ভাড়া থাকতেন তিনি।
শনিবার (৩০ মে) দিবাগত গভীর রাতের যেকোনো সময় ওই কক্ষে বসে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে সুইসাইড নোট লিখে তিনি একাধিক বিষাক্ত ট্যাবলেট সেবন করেন। তার ফেসবুকের স্ট্যাটাস দেখে ঘটনাস্থলের অদূরেই চরহোসনাবাদ এলাকায় থাকা আপন ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস (এলো) ও সৎ মা হেনা বেগম দৌড়ে এসে ওই ভবনের সামনে ডাকচিৎকার করেন। টের পেয়ে রাকিব অসুস্থ অবস্থায় জানালা খুলে তিন তলা থেকে চাবি নীচে ফেলেন। চাবি পেয়ে বোন এলো ও সৎ মা হেনা ওপরে উঠে ওই কক্ষে প্রবেশ করে রাকিবকে দ্রুত দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রাহুল বিন হালিম প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর আশংকাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রাকিবকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে ভোর সাড়ে ৬ টার দিকে দশমিনা-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের বাউফল এলাকায় তার মৃত্যু হয়।
ভোর রাত অনুমান ৪ টার দিকে ফেসবুকে সুইসাইড নোটে রাকিব লিখেছেন, "আসসালামু আলাইকুম। একটা মানুষ জীবনে কত যুদ্ধ করতে পারে। যুদ্ধ করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত। আপন আপন বলা মানুষগুলো ভালো থাকুক। আফসোস এটাই যে, রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলো আমাকে চিনতে পারলোনা। এক দিনের বা অল্প কষ্টে দুনিয়ার মায়া কেউ ছাড়েনা। আমার মৃত্যুর পর আমাকে যেনো আমার মায়ের পাশে দাফন করা হয়। শাহজাহান মেলকারের পরিবারের কোনো লোক যেনো আমার মুখ না দেখে, যদি কেউ দেখে বা দেখায় তার প্রতি আমার কেয়ামত পর্যন্ত দাবী থাকবে। দশমিনায় ফার্মেসীর আমি অংশীদার। দোকানে কত টাকা দিয়েছি তার হিসেব খাতায় লেখা আছে। গৌতম যেনো কোনোভাবেই হয়রানী না হয়। গৌতম খুব ভালো ছেলে। এ যুগে এমন ছেলে হয়না। গৌতমের কাছ থেকে আমার ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস (এলো) হিসেব নিবে, গৌতম যা বলবে তাই। এর বাইরে যেনো কিছু না হয় এটা আমার দাবী। ছোটবেলা থেকেই পরিবার ছাড়া বড় হয়েছি। রক্তের মানুষগুলোর কাছে কখনও কিছু পাইনি শুধু অবহেলা ছাড়া। জীবনে যাদের কাছ থেকে পেয়েছি তাদের সাথে আমার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। আজ আমি যাবার সময় তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই আমার। তবে অনেক স্বপ্ন ছিলো। বাঁচার ইচ্ছে ছিলো। তা আর হলোনা। চলার পথে যদি কেউ আমার আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকেন আমাকে মাফ করে দিবেন। পরিশেষে, দুঃখের ঘরে জন্ম নেয়া, কস্টের সাথে বেড়ে ওঠা ছেলেটার জীবনের সমাপ্তি।
এর আগে একই সন্ধ্যা রাত ৭ টার দিকে রাকিব তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখছেন, "দুনিয়ার মায়া মানুষ কখন ছাড়ে কেউ কি বলতে পারেন?"
দশমিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় পরিবারের কারও কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং পরিবার ও স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাংবাদিক রাকিবের মরদেহ দাফনের জন্য তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে রোববার (৩১ মে) সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে রাকিবের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশগ্রহণ করেন সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নূর, এমপি, দশমিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা, ওসি দশমিনা থানা মো. আতিকুল ইসলাম, দশমিনা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. বেল্লাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক আমাদের সময় প্রতিনিধি শাহজাদা তোহামিন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেট্রনিকস মিডিয়ার সাংবাদিকসহ স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষ।
পরে দাফনের জন্য সাংবাদিক রাকিবের মরদেহ নিয়ে জেলার গলাচিপার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের উত্তর চরবিশ্বাস গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন স্বজনরা।
এই সংবাদটির তথ্য নির্ভর কিনা — নিচে মন্তব্য করে জানান।
কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী
স্টাফ রিপোর্টার
কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী এশিয়ান টাইমস ২৪-এর একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক, যিনি সারাদেশ বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি করেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরে।
বিজ্ঞাপন


